
স্ব-হস্তে লেখা চিঠির মধ্যেই হৃদয়ের শত সহস্র কথা ও তার আবেগ, আকুলতা এবং ব্যাকুলতা সব বিষয় প্রকাশ পেত। মা-বাবা তাঁর সন্তনের হাতের লেখা চিঠিটা যখন কাছে পেত, ঠিক তখনই যেন লেখাটিতে কোমল হৃদয় দিয়ে পড়ে। চিঠির মধ্যেই বাবা মা নিজের সন্তানের মুখটাও দেখতে পেতো। অবচেতনে চিঠি বুকে জড়িয়েও আদর করে। প্রাচীন কাল থেকেই মানুষ চিঠি আদানপ্রদান করেছে, ইলিয়াডে তার উল্লেখ ছিল। হিরোডোটাস ও থুসিডাইডিসের রচনাবলীতে তা উল্লেখ করাও আছে। অশিক্ষিত মানুষরা শুধুমাত্র চিঠি পড়া ও লেখার জন্যেই যেন স্বাক্ষরতা অর্জনের খুব চেষ্টা করেছিল। সেই সময়ে স্বাক্ষরতা টিকিয়ে রাখার বিশাল অবদান 'চিঠি'। আবার পারিবারিক চিঠি গুলো অনেক সময় খবরের কাগজের বিকল্প হিসাবেই যেন ব্যবহার করেছিল। কোনো চিঠিতে গ্রামের যেকোন ঘটনা ও আশা ভরসার খবর, আবাদের খবর বা প্রকৃতিক দুর্যোগের খবরসহ বিভিন্ন খবর লেখা থাকত। আসলে, হাতে লেখা চিঠি পরিবারের মধ্যে যেন নিবিড় সম্পর্ক ও ভালবাসার গভীরতার সেতু বন্ধন সৃষ্টি হতো। প্রেম ভালোবাসার চিঠি গুলো তো ছিল একেকটি কালজয়ী বৃহৎ প্রেমের ইতিহাস।
চিঠি নিয়ে সে সময়ের বহু স্মৃতির মতো এখনকার আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি যুগে তেমন স্মৃতি স্মরণ রাখার মতো নেই বললেই চলে। চিঠিপত্র লেখাকে কেন্দ্র করেই বেড়ে গিয়েছিল চিঠি লেখাকে পেশা রূপে নেয়ার প্রবণতা। ডাকঘরের বারান্দায় লাইনের পর লাইন ধরেই সকল শ্রেণীর মানুষের ভিড় লেগেই থাকত। ডাকটিকিট, পোস্টাল অর্ডার, ইনভেলাপ, রেজিস্ট্রিচিঠি, মনিঅর্ডার, পোস্ট কার্ড, বীমা, পার্সেল, জিএমই, ভিপিপি, ইএমএস, স্মারক ডাকটিকিট, ডাক জীবনবীমা, লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক সহ সরকারি কর্মচারীদের বেতন। এমনকি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পও ডাকঘর থেকেই যেন সংগ্রহ করতো। এ গুলো চাহিদাতেই চিঠিপত্রের আদান প্রদানের মাধ্যম খুব দ্রুতগতিতে জনপ্রিয় হয়ে উঠ ছিল। তখনকার যুগে যে সব মানুষরা লেখাপড়া জানতোই না, ডাকঘরের লেখকেরা সেই ডাকঘরের বারান্দাতে কিংবা সুবিধাজনক স্থানেই চেয়ার-টেবিল বসিয়ে লেখাপড়া না জানা মানুষের পে চিঠিপত্র, মনিঅর্ডার কিংবা মালামাল প্রেরণসংক্রান্ত কাজ করে দিতো।
আবার অনেক দিনের চিঠিগুলি তারা যেন ফেলে দিতো না। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই সাইকেলের স্পোকের মাথায় বড়শির মতো করে তার মধ্যেই যেন গেঁথে রাখতো। সেই চিঠিগুলো তাদের নীরব স্বাক্ষী। বাজারে রাইটিং প্যাডও (চিঠি লেখার প্যাড) পাওয়া যেতো। রঙ-বেরঙের হরেক রকমের প্যাডে প্রিয়জনের নিকটে সুস্পষ্ট হরফে বিভিন্ন কালি বা কলমের মাধ্যমে চিঠি লিখতো। আবার চিঠিটা লিখে, আঠা দিয়ে খামের মুখটা বন্ধ করে তাতে স্ট্যাম্প সেঁটে, বহুদূর হেঁটে গিয়ে যেন ডাকবাক্সে চিঠি ফেলতো।প্রেম ও ভালোবাসার ক্ষেত্রে তাদের যদি- প্রেমের ব্যর্থতা আসতো, সেক্ষেত্রে চিঠি দিয়ে অনুভূতি গুলোকে প্রকাশ করতো। 
সম্পাদক: আরিফুর রহমান সুমন
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৮৭ পুরানা পল্টন লেন, পল্টন টাওয়ার, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
@২০১৮-২০২২ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ।। এসএস২৪বিডি.কম