
‘শিক্ষাই আলো’ ‘সুশিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড’ সুশিক্ষিত জাতি আগামীর ভবিষ্যৎ। মানব সভ্যতার বয়স যতদিন, শিক্ষার বয়সও ততদিন। কারণ মানুষকে সৃষ্টিকর্তা একজন জ্ঞানী ও খলীফা হিসেবে প্রেরণ করেছেন। উম্মতে মুহাম্মদীর শিক্ষা ব্যবস্থা সূচনা হয় সৃষ্টিকর্তার বাণী- পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন (সূরা: আলাক্ব, আয়াত-১)। মসজিদে নববীতে অবস্থিত ‘সুফফা’ হলো ইসলামের প্রথম শিক্ষা কেন্দ্র বা বিশ্ববিদ্যালয়। রাসুল সা. ছিলেন প্রথম শিক্ষক এবং সাহাবীগণ প্রথম ছাত্র। এখান থেকে শিক্ষার ইতিহাস শুরু হয়। খোলাফায়ে রাশেদীন, উমাইয়া ও আব্বাসীয় খলিফাদের যুগে ইসলামি শিক্ষার ব্যাপক উন্নতি ঘটে এবং শিক্ষা ব্যবস্থা একটি পরিপূর্ণতা লাভ করে। মুসলিম শাসিত ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসকগণ শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক অবদান রাখেন। তারা ইসলামি শিক্ষার বুনিয়াদি কাঠামো দাঁড় করিয়ে ছিলেন। শুধু রাজধানী দিল্লিতেই ১০০০ মাদরাসা ছিল। প্রফেসর ম্যাক্স মুলারের মতে ব্রিটিশ শাসনের পূর্বে শুধু বাংলাতেই ৮০ হাজার মাদরাসা ছিল। ক্যাপ্টেন হেমিলটনের মতে, সিন্ধুর প্রসিদ্ধ ঠাট্টানগরীতে জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং শিল্পকলার চারশত প্রতিষ্ঠান ছিল। ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে পরাজয়ের পর উপমহাদেশের মুসলিম শাসনের ইতি ঘটে। সূচনা হয় ইংরেজ শাসন। ইংরেজগণ তাদের শাসন ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ঠিকিয়ে রাখার জন্য নীতি প্রয়োগ করে। মূল লক্ষ্য ছিল দ্বিমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে মুসলমানদের মাঝে জাতিগত বিভেদ সৃষ্টি করা। ১৮৩৫ সালে লর্ড মেকেলের সুপারিশকৃত শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে দুই বিপরীতমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলনের উদ্দেশ্য সুষ্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। তাদের এ নীতি সফলতার সাথে বাস্তবায়ন হয়েছে। বৃটিশ আমাদের এ দেশ থেকে চলে গেছে সেই ১৯৪৭ সালে ঠিকই কিন্তু তাদের সৃষ্ঠ শিক্ষাব্যবস্থা আজো অক্ষুন্ন আছে। এ দীর্ঘ সময়ে পাঠ্যসূচিতে কিছুটা পরিবর্তন আসলেও শিক্ষানীতির মূল কাঠামো আজও অপরিবর্তিত।
আল্লামা ইকবাল বলেন- খুদি বা রুহের উন্নয়ন ঘটানোর প্রক্রিয়ার নামই শিক্ষা। শিক্ষার ক্ষেত্রে ইসলামী আদর্শে কাজ হলো পরিপূর্ণ মানবসত্তার লালন করে এমনভাবে গড়ে তোলা। যার এমন একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি যে, মানুষ তার দেহ, বুদ্ধিবৃত্তি এবং আত্মা তার বস্তুগত ও আত্মিক জীবন এবং পার্থিব জীবনের প্রতিটি কার্যকলাপের কোনটিই পরিত্যাগ করে না। আর কোন একটির প্রতি অবহেলা বা মাত্রাতিরিক্ত ঝুঁকেও পড়ে না। মিল্টনের মতে- শিক্ষা হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে বিকশিত মুক্ত সচেতন মানবসত্তাকে সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে উন্নত যোগসূত্র রচনা করার একটি চিরন্তন প্রক্রিয়া যেমনটি প্রকাশিত হয়েছে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক, আবেগগত এবং ইচ্ছাশক্তি সম্বন্ধীয় পরিবেশে। শিক্ষার উদ্দেশ্যই নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ তৈরি করা। সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে মানবজাতিকে সঠিক জীবন যাপনের জন্য যেসব নবী-রাসূলগণকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছিল তাদের কাজ সম্পর্কে সৃষ্টিকর্তা বলেন- তারা আল্লাহর আয়াত বা নিদর্শন বা সত্য-মিথ্যার পার্থক্য সম্পর্কে মানুষকে পড়ে শুনান। আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেন আর শিক্ষা দেন জীবন যাপনের কৌশল। অথচ এর পূর্বে তারা ছিল সুষ্পষ্ট গুমরাহীতে নিমজ্জিত (সূরা: জুমআ, আয়াত- ২)।
ইসলামি যুগের শুরুতে, মধ্যযুগে এবং অতি সাম্প্রতিক কালেও ঔপনিবেশিক যুগের আগ পর্যন্ত মুসলিম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব ছিল কুরআন, হাদিস, সিরাত ও ফিকাহর ওপর। এর সাথে সাথে সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, যাবতীয় সাইন্স এসবের গুরুত্ব ছিল। ইসলামে শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা পৃথিবীর কোন ধর্মগ্রন্থে বা মনীষীর বাণীতে পাওয়া যাবে না। কুরআনের প্রথম শব্দই শিক্ষা সংক্রান্ত। সৃষ্টিকর্তা বলেন- পড়ুন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট বাঁধা রক্ত থেকে। পড়ুন আর আপনার রব মহামহিমান্বিত। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না (সূরা: আলাক, আয়াত- ১-৫)। রাসুল সা. হেরা গুহায় অহি প্রাপ্ত হয়ে ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় ফিরে এসে তাঁর সহধর্মিনী খাদিজা রা.-এর নিকট সমস্ত ঘটনা খুলে বলেন। রাসুল সা. আল্লাহর পক্ষ থেকে শিক্ষা লাভ করে ঘোষণা করেন- আমি শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি (ইবনে মাজাহ)। অনত্রে- জ্ঞানার্জন প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ (ইবনে মাজাহ )। নিরক্ষরতা দূরীকরণের লক্ষ্যে রাসুল সা. ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধে যুদ্ধ বন্দি ৭০ জনের মুক্তিপণ হিসেবে ঘোষণা করেন, যারা লেখাপড়া জানেন তারা ১০ জন নিরক্ষর ব্যক্তিকে অক্ষর জ্ঞান দান করে মুক্তি পাবেন। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম আনুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি সেটা হলো ‘দারুল আরকাম’। বিশিষ্ট সাহাবী আরকাম রা. ছিলেন এই ঘরের মালিক। মুসলমান হওয়ার পর তিনি ইসলামের জন্য এই ঘরটি ওয়াক্ফ করে দেন।
মদীনার মুসলমানদের আবেদনের প্রেক্ষিতে রাসুল সা. মুস’আব ইবনে উমায়ের রা.- কে শিক্ষক হিসেবে মদীনায় প্রেরণ করেন। তিনি আবু উসামা ইবেন যুরারার বাড়িতে অবস্থান করে কুরআন শিক্ষা দিতেন। সেটিই মদীনার প্রথম শিক্ষালয় হিসেবে পরিগণিত হয়। হিজরতের সময় রাসুল সা.-এর বাহন উটনী আবু আইয়ুব আনসারী রা. বাড়িতে গিয়ে থেমে যায়। রাসুল সা. সেই বাড়িতে অবস্থান করে প্রায় ৮ মাস শিক্ষাক্রম চালিয়ে যান। মসজিদে নববীর উত্তর পার্শ্বে খেজুর পাতায় ছাউনি দিয়ে একটি আবাসস্থল প্রণয়ন করা হয়। ইসলামের ইতিহাসে ‘সুফফাহ’ নামে পরিচিত। রাসুল সা.-এর শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল একীভূত শিক্ষাব্যবস্থা। সেখানে কোনো ভেদাভেদ ছিলনা। সকলেই জ্ঞান লাভের সমান সুযোগ পেত। রাসুল সা. কন্যা সন্তানদের শিক্ষা দানের ব্যাপারে যথেষ্ট উৎসাহ প্রদান করেছেন। রাসুল সা. ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি তিনটি কন্যাসন্তানকে লালন-পালন করবে, তাদেরকে শিষ্টাচার শিক্ষা দিবে তাদের বিয়ে দিবে এবং তাদের সাথে ভালো আচরণ করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে (আবু দাউদ)। রাসুল সা. এর সহধর্মিনী আয়শা রা. শিক্ষা-দীক্ষায় বিরাট অবদান রাখেন। তিনি হাদীস, ফিকাহ শাস্ত্রসহ সকল বিষয়ে বুৎপত্তি অর্জন করেন। তাঁর থেকে ২২১০টি হাদীস বর্ণিত হয়।
ঈমানের পরে ইলমই হলো আল্লাহর নিকট মর্যাদা বৃদ্ধির প্রথম উপায়। সৃষ্টিকর্তা বলেন- তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে ইলম বা জ্ঞান প্রদান করা হয়েছে তাদের মর্যাদা আল্লাহ বাড়িয়ে দিবেন (সূরা: মুজাদালা, আয়াত- ১১)। ইলম শিক্ষা করার জন্য পথ চলা, হাঁটা, কষ্ট করা ইত্যাদিও ইবাদাত। এগুলির মর্যাদা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত বেশি। (বুখারি, মুসলিম)। শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে ক্বারীর মর্যাদা সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. হতে বর্ণিত- রাসুল সা. ইরশাদ করেন- কুরআনের ক্বারীকে বলা হবে পড়ুন এবং সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে উঠতে থাকুন এবং সুমধুর কণ্ঠে পড়তে থাকুন যেভাবে তারতীলের সাথে দুনিয়াতে পড়েছেন। নিশ্চয় আপনার গন্তব্য হবে সেখানে, যেখানে পড়া শেষ হবে (তিরমিযি, আবু দাউদ )। আলী ইবনে আবু তালিব রা. হতে বর্ণিত- রাসুল সা. ইরশাদ করেন- অর্থাৎ যে কুরআন পড়ল অত:পর মুখস্ত করল এবং হালালকে হালাল ও হারামকে হারাম মেনে চলল। আল্লাহ তা’আলা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করবেন এবং তাকে ঐ সমস্ত দশ জনকে সুপারিশ করার সুযোগ দিবেন যাদের প্রত্যেকের জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়ে গিয়েছে (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ও বায়হাকী)। জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. হতে বর্ণিত- রাসুল সা. ইরশাদ করেন- আলিম ও আবেদের পুনরুত্থান হবে। অত:পর আবেদকে বলা হবে তুমি জান্নাতে যাও। আর আলেমকে বলা হবে তুমি দাঁড়াও, যাতে তুমি যে শিক্ষা দিয়েছ সে কারণে সুপারিশ করতে পার (বায়হাকী)।
মাদরাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে বড় অবদান হলো সৎ ও আদর্শ ব্যক্তি গঠন। পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের পর ইসলাম ও মুসলমানদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছিল তা থেকে উত্তরণের নিমিত্তে ১৮৬৬ সালের ৩০ মে মাওলান ক্বাসেম নানুতবী রহ. প্রতিষ্ঠা করেন ‘দারুল উলুম দেওবন্দ’ মাদরাসা। স্যার সৈয়দ আমহদ খান স্থাপন করেন আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়। ১৭৮১ সালে মুসলমানদের চাপের মুখে আরবি শিক্ষার ব্যবস্থা স্বরূপ কলকাতায় (পশ্চিমবঙ্গে) বর্তমান ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বà¦
